প্রকৌশল শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের করণীয়

বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি প্রধান চালিকা শক্তি হল প্রকৌশলীরা। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আজ বাংলাদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তৈরি হয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, বিভিন্ন প্রকারের বড় ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, বিভিন্ন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক নবীন প্রকৌশল গ্র্যজুয়েট বের হছে। কিন্তু আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান এখনো কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার নানান সীমাবদ্ধতার কারণে। আমরা এখনো দেশের প্রধান প্রধান উন্নয়ন প্রকল্পে অনেক অর্থ ব্যয় করে বিদেশি প্রকৌশলী ভাড়া করে আনি। এই সব কাজের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মান সামগ্রী এবং যন্ত্রপাতিও আমরা বিদেশ থেকে ভাড়া করে অথবা কিনে আনি। কারণ হচ্ছে আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আমরা তৈরি করতে পারিনি যার ফলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা সেইরকম দক্ষ প্রকৌশলী হতে পারছে না। আমাদের দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনটাই এখনো পুরোপুরিভাবে আউটকাম ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। তাই এখনো বাংলাদেশ ওয়াশিংটন চুক্তির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি, আমরা এখনো এর সাময়িক সদস্য। অথচ পাকিস্তান এই চুক্তির আওতায় এসেছিল বাংলাদেশের পরে আর তারা ২০১৭ সালেই এই চুক্তির পূর্ণ সদস্যপদ পেয়ে গিয়েছে। এই চুক্তির পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করতে হলে আমাদের এখনো আর অনেক দূর পথ পারি দিতে হবে। এই চুক্তির আওতায় এখন মোট ১৯টি দেশ পূর্ণ সদস্যের তালিকায় রয়েছে। ক্রমেই এই তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। যারা এর পূর্ণ সদস্য হবে তাদের গ্র্যাজুয়েটরা পরে এইসব দেশের যে কোন প্রকৌশল কার্যে সরাসরি অংশগ্রহন করতে পারবে কোন পরীক্ষা ছাড়া।

আমরা উন্নয়নের কথা বলি অথচ শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়ন ছাড়া এইসব কোন উন্নয়নই টেকসই করা যাবে না। কারন বর্তমান সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা। যে সমাজ বা রাষ্ট্র জ্ঞান বিজ্ঞানে যত উন্নত হবে সেই সমাজ বা রাষ্ট্র তত টেকসই হবে। তাই আমাদের বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ওয়াশিংটন চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের হয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের অধীনস্থ ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি আক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএইটিই)’ যা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই বোর্ড কিছু গাইডলাইন তৈরি করেছে যা তাদের ম্যানুয়ালে বিস্তারিত আলোচনা  করা আছে। সেভাবে আমরা যদি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে পারি তাহলেই আমরা অনেক ভাল গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারব। কিন্তু আমরা বাংলাদেশে সকল ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়তি কিছু না কিছ সমস্যার সম্মুখীন হই। সেগুলোর সমাধানকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ করাও অতি জরুরী। তারপরেও আমাদের শিক্ষকদের নিজেদের অবস্থানে থেকে সর্বাত্নক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শিক্ষাকে একটি উন্নত পর্যায়ে তথা বিশ্বমানে নিয়ে যেতে।

এখানে বিএইটিই-র ম্যানুয়্যাল এবং আমার নিজস্ব মতামত অনুযায়ী প্রকৌশল শিক্ষার শিক্ষকবৃন্দে উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলঃ

১। উন্নত দেশগুলোর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাশ উপস্থিতি নেয়া হয় না। ছাত্র-ছাত্রীরা যদি মনে করে তাদের ক্লাস করার প্রয়োজন আছে তাহলে তারা এমনিতেই ক্লাসে আসবে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। এখানে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাশ করা প্রয়োজন কি-না সেটা বুঝে না, তারা অনেকেই চায় ক্লাশ ফাঁকি দিতে। তাই আমাদের দেশের অনেক শিক্ষাবিদরা নানান চিন্তাভাবনা করেই হয়ত ক্লাশে উপস্থিতি নেয়ার একটা ব্যবস্থা করেছেন এবং সেখানে নম্বর বরাদ্দ রেখেছেন। কিন্তু শুধুমাত্র ক্লাশে উপস্থিতি নেয়া এবং উপস্থিতির জন্য যে নম্বর দেয়ার ব্যবস্থা আছে সেটা না করে যদি বলা হয় প্রতি ক্লাশে একটা পাঠ মূল্যায়ন নেয়া হবে, কে কেমন পারফর্ম করল সেটা দেখা হবে, ক্লাশে প্রশ্নোত্তর পর্বে বা আলোচনার জন্য বরাদ্দকৃত অংশে কে কেমন করল বা কতটুকু অংশগ্রহণ করল সেটা ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেডিং-এর সময় বিবেচনায় নেয়া হবে তাহলে ক্লাশে উপস্থিতি বাড়বে। তবে এসব মূল্যায়ন করা এত সহজ একজন শিক্ষকের পক্ষে সহজ কাজ নয়। এসব করার জন্য সঠিক নিয়ম তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ক্লাশে অংশগ্রহণের মূল্যায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় রুব্রিক তৈরি করতে হবে এবং সেমিস্টারের শুরুতেই (আমি মনে করি প্রথম ক্লাশেই) সেগুলো তাদের জানিয়ে দিতে হবে। এছাড়া এইসব পারফরমেন্স প্যারামিটারগুলো গ্রেডিং-এ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সফটওয়্যার ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে এবং ডাটাবেজে নম্বর ইনপুট দেয়ার জন্য শিক্ষকদের জন্য কিছু টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের ব্যবস্থা থাকতে হবে; কিংবা ল্যাবের সহকারীদেরও এইসব কাজে লাগানো যেতে পারে।

২। শিক্ষককে প্রতি ক্লাশের জন্য লেকচারের ক্রমানুসারে সেশন বাই সেশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে, সে অনুযায়ী ক্লাশ পরিচালনা করতে হবে। এজন্য তাদের প্রথম দিনের ক্লাশটা হবে কোর্স সিলেবাস ও সেশন প্ল্যান বুঝানো সংক্রান্ত। কোর্স সিলেবাসে লেকচার প্ল্যান ছাড়াও কোর্স অবজেক্টিভ (উদ্দেশ্য) ও কোর্স আউটকাম (শিক্ষার্থীর কি ফলাফল লাভ হবে), প্রোগ্রাম আউটকামের সাথে কোর্স আউটকামের ম্যাপিং (শিক্ষার্থী কোন কোর্স আউটকাম দ্বারা তার প্রোগ্রামের কোন কোন আউটকাম হাসিল করতে পারবে তার সম্পর্ক তৈরি করে দেখানো), শিক্ষণ পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কোন ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত নম্বর কত, টেক্সট ও রেফারেন্স বইয়ের নাম ইত্যাদি বলে দিতে হবে। ক্লাশে অনিয়ম করলে কি শাস্তি হবে তা-ও বলে দিতে হবে। এছাড়া মিডটার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষার নিয়ম, প্রশ্নের মান-বণ্টন, গ্রেডিং পদ্ধতি এইসব বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে হবে। সবকিছুই সুনির্দিষ্ট নিয়মে লিখিত আকারে তৈরি করে দিতে হবে। বিভাগের একাডেমিক কমিটি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়ে একটি ফর্মেট তৈরি করে দিতে পারে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ালিটি এশিউরেন্স সেলও এটা তৈরি করতে পারে। তবে এই ফর্মেট যেন বিএইটিই গাইডলাইন্স অনুসারে হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

৩। ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য ক্লাশ টেষ্ট নেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের পদ্ধতিকে বলা হয় ফর্মেটিভ টেষ্ট। এখানে কিছু প্রশ্ন রাখতে হবে বহুনির্বাচনী যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। বড় প্রশ্নের জন্য বই খুলে যেন উত্তর দিতে পারে সেইরকম ব্যবস্থাও করা যায় অথবা অন্তত ফর্মুলাগুলো এবং বিভিন্ন ধুবকের মান প্রশ্নে দিয়ে দেয়া ভাল। কিছু প্রশ্ন রাখতে হবে যেগুলো হবে কগনিটিভ ডোমেইনের নিচের স্তরের আর কিছু প্রশ্ন করতে হবে উঁচু স্তরের। এতে করে সকল স্তরের শিক্ষার্থীরাই কিছু না কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। কতগুলো ক্লাশ টেষ্ট নেয়া হবে সেটা নির্ভর করে কোর্সে ক্রেডিট কত। যেমন, তিন ক্রেডিট কোর্সের জন্য কমপক্ষে তিনটি ক্লাশ টেষ্টের নম্বর মূল্যায়নে আনা উচিৎ। তবে দু’একটি বেশি ক্লাশ টেষ্ট নিয়ে সেরা তিনটিও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। যেহেতু ক্লাশ টেষ্ট ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটি অংশ তাই এগুলোর সময় হবে খুব কম, ১০-১৫ মিনিট এবং এগুলো নিতে হবে সমগ্র সেমিষ্টার জুরে যাতে শিক্ষার্থীরা সব সময়ই পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় অনেক শিক্ষক সেমিষ্টারের শেষে এসে একবারে অনেকগুলো ক্লাশ টেষ্ট নেন, কিন্তু তাতে কিন্তু ধারাবাহিক মূল্যায়নের আসল উদ্দেশ্যই আদায় হল না।

৪। চূড়ান্ত মূল্যায়নের বরাদ্দকৃত নম্বরটুকু হচ্ছে সাধারণত মিড-টার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। এটাকে বলা হয় সামেটিভ টেষ্ট। আমাদের বাংলাদেশে অধিকাংশ শিক্ষকবৃন্দ পরীক্ষার প্রশ্ন এমনভাবে তৈরি করেন যাতে একজন ছাত্র শুধু কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করেই “এ” গ্রেড পেয়ে পাশ করে যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষকবৃন্দের প্রশ্নপত্র নির্বাচন করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু মুখস্থ করে উত্তর লিখে ফেলতে না পারে, বরং তারা যেন জ্ঞানার্জনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়। আর শিক্ষক মহোদয়েরা যদি এই কাজটি করতে পারেন তাহলে শিক্ষার্থীরাও ক্লাশে আসবে এবং জানার ও শেখার ব্যাপারে চেষ্টা করে যাবে। এই পরীক্ষাগুলোতে কিছু প্রশ্ন রাখতে হবে যেগুলো হবে কগনিটিভ ডোমেইনের নিচের স্তরের (যেমন, যেসব প্রশ্নগুলো সহজে বুঝতে পারা যায়, যেগুলোর উত্তরও কেবল একটাই হয় এবং সাধারণ সূত্র প্রয়োগ করে করা যায়) তবে বেশিরভাগ প্রশ্ন করতে হবে উঁচু স্তর থেকে (যেমন, যেসব প্রশ্নগুলো সহজে বুঝতে পারা যায় না, যেগুলোর উত্তর একাধিক হতে পারে এবং সাধারণ সূত্র প্রয়োগ করে করা যায় না, জটিল এবং অনেকগুলো সুত্র প্রয়োগ করে করতে হয় ইত্যাদি)। প্রশ্নগুলো থেকে কোন কোন কোর্স আউটকাম শিক্ষার্থীরা হাসিল করবে তা-ও নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। বিভাগের একাডেমিক কমিটি বিএইটিই গাইডলাইন্স অনুসারে একটি ফর্মেট তৈরি করে দিতে পারে। বিভাগের প্রশ্ন মডারেশন কমিটিকে চেক করতে হবে যে গাইডলাইন্স অনুসারে প্রশ্ন প্রণয়ন করা হয়েছে কি-না। এই ব্যাপারে শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ব্যাপারে বিএইটিই-র সহযোগিতা নিতে পারে। সেখান থেকে যোগ্য প্রশিক্ষক সরবরাহ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ক্যাম্পাসে গিয়ে শিক্ষদের প্রশিক্ষন প্রদানের। অবশ্য এজন্য বিএইটিই বরাবর আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হয়।

৫। ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাশের প্রতি আগ্রহ তৈরির জন্য তাদেরকে ক্লাসে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যেমন, ক্লাশে হঠাৎ করে কোন ঘোষণা না দিয়ে কোন অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ, বা কোনো বিষয়ের ওপর প্রেজেন্টেশন দেয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। তবে এগুলো হতে হবে শুধুমাত্র ওই দিনের সংশ্লিষ্ট লেকচারের বিষয়ের উপর এবং খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য, যেমন ৫-১০ মিনিটের। এইসব বিষয় যে ধারাবাহিক মূল্যায়নের (ফর্মেটিভ টেষ্ট) অংশ তা কিন্তু শুরুর ক্লাশে বলে দিতে হবে এবং কোর্স সিলেবাসে তা লিখিত আকারে থাকতে হবে যার একটি বিভাগীয় প্রধানে অফিসেও জমা দিতে হবে। আর একটি কথা এই প্রসঙ্গে বলে নিই, তা হল বিভাগীয় প্রধানের পক্ষে হয় প্রতিটি শিক্ষকের কোর্স সিলেবাস মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই বিভাগের উচিৎ একটি টিচিং কোয়ালিটি কন্ট্রল (শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রন) কমিটি তৈরি করা যার প্রধান হবেন বিভাগীয় প্রধান নিজে এবং তিনি কাজ ভাগ করে দিবেন বাকী সদস্যদের মধ্যে। তারা মাঝে মাঝে মিটিং করে অন্য শিক্ষদের পরামর্শ দিবেন কিভাবে তারা মান আরও বাড়াতে পারেন। এভাবে প্রতিনিয়ত মান বৃদ্ধির চেষ্টা করে যেতে হবে।

৬। শিক্ষার্হীরা যেন প্রথম বর্ষ থেকেই পেশাগত জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয় সেজন্য তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা সংক্রান্ত সেমিনার, ওয়ার্কশপ, লেকচার সিরিজে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। সেটা করার জন্য বিভাগের ক্লাব, আইইবি কিংবা আইইইই-র বাংলাদেশ সেকশনের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের দিকে যথেষ্ট নজর দিতে হবে এবং প্রতি সেমিষ্টারেই বিভিন্ন বিষয়ের উপর সার্টিফিকেট কোর্সের আয়োজন করতে হবে। এইসব কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করতে বিভাগের পক্ষ থেকে প্রকৌশল পেশায় দক্ষতাসম্পন্ন ও সফল ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষার্থীদের অনেক পরামর্শ ও বাস্তব কর্মজীবন সম্পর্কে অনেক ধারণা দিতে পারবে। তাতে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বেই প্রাক-প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে।

৭। একটি কোর্স সঠিকভাবে পরিচালনা ও সমাপ্ত করার জন্য একজন শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। যেমন, কোর্স শুরু করার আগে কোর্সের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ, ক্লাশের প্রথম দিনে এবং অন্যান্য সময়ে কোর্সের প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তব কর্ম জীবনে এর প্রয়োগ ও উপযোগিতা ব্যাখ্যা করা, ক্লাশের মাঝে কোর্সের আকর্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা, জটিল বিষয়বস্তু পড়ানোর আগে সেটি সম্পর্কে একটু প্রস্তুতিমূলক ধারণা দেয়ার জন্য এর প্রয়োজনীয় তত্ত্ব-তথ্যগুলো উপস্থাপন করা, জটিল সিস্টেম বা সার্কিট বোর্ডে এঁকে সময় নষ্ট না করে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা, প্রতিটি স্লাইড সুন্দরভাবে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বুঝানোর চেষ্টা করা, কোর্সের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা, প্রতিটি বিষয় কেনইবা পড়ানো হচ্ছে, বিভিন্ন বিষয়ে অতীতে ও বর্তমানে দেশে ও বিদেশে কী ধরনের গবেষণা কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে ও হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা শেষ বর্ষে সম্ভাব্য কী বিষয় নিয়ে গবেষণা কর্মকান্ড করতে পারে ইত্যাদি ব্যাপারগুলো নিয়েও আলোচনা করতে হবে।

৮। বিভাগের প্রতিটি শিক্ষককে তার ক্লাশ রুটিন তার রুমের দরজার বাহিরের দিকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ওয়েবসাইটে শিক্ষক পোর্টাল দিয়ে থাকেন সেখানেও এগুলো আপলোড করে দিতে হবে। সেখানে ক্লাশের রুটিনের পাশাপাশি একাডেমিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য সময়, টিউটোরিয়াল ক্লাশের সময় এগুলোও দিতে হবে। বিভাগের প্রতিটি শিক্ষককে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় একাডেমিক টিউটোরিয়াল এবং সপ্তাহে অন্তত দুইদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় একাডেমিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে এইসব কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় স্থান বরাদ্দ করে দিতে হবে।

৯। আমাদের বাংলাদেশে বেশিরভাগ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের এক একটি সেকশনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ থেকে ১০০ জনের মত। ক্লাশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে উপরে যতগুলো শিক্ষদের করণীয় কাজের কথা বলে আসলাম তা সম্পাদন করা প্রায় অসম্ভব। একজন শিক্ষকের পক্ষে এতগুলো শিক্ষার্থীর অ্যাসাইনমেন্ট দেখা, কুইজ নেয়া, মিডটার্ম এবং ফাইনাল পরীক্ষার খাতা দেখা, নম্বর তোলা, সফটওয়্যারে ডাটা ইনপুট দেয়া, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষার খাতা ও ফলাফল জমা দেয়ার কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য অবশ্যই ক্লাশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমাতে হবে। আমার মতে তত্ত্বীয় ক্লাশের জন্য আদর্শ ক্লাশ সাইজ হল ৩০-৩৫ আর ব্যবহারিক ক্লাশের জন্য সেই সংখ্যাটা ১৫-১৮। তাহলে ক্লাশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা আরও সহজ হবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষকবৃন্দ আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।

১০। বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি ল্যাব প্র্যাকটিস সেশনের জন্য সময় বরাদ্দ থাকতে হবে যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ল্যাব এক্সপেরিমেন্টের উপর পরে আবার প্র্যাক্টিস করতে পারবে এবং প্রতিটি ল্যাবের জন্য আলাদা ল্যাব সহকারী বা প্রশিক্ষক থাকবে যারা তাদেরকে প্র্যাক্টিসের সময় সাহায্য করবে।

১১। একজন শিক্ষক ক্লাশে কেমন পড়ালেন, শিক্ষার্থীদের কাছে কোর্সটি কেমন লাগল এবং তারা কি জিনিস এই কোর্স করার মাধ্যমে শিখল সে বিষয়ে তাদের কাছ থেকে অন্তত তিনভাবে মতামত নেয়া উচিৎ। এটার মানে এই না যে শিক্ষার্থীরা যা বলবে তা-ই সব। কিন্তু এটা থেকে ওই ক্লাশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক এবং কোর্স সম্পর্কে তাদের অনুভুতির কিছুটা জানা যাবে। সেটা যদি সেই শিক্ষক গ্রেডিং-এর পর জানতে পারেন তাহলে তিনি পরবর্তীতে তাদের মতামত অনুযায়ী কোর্সটাকে নতুন করে সাজাতে ও উপস্থাপন করতে পারতেন। এই কাজগুলো একজন শিক্ষককে প্রতিটি সেমিষ্টারেই করতে হবে।

১২। শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষকের মূল্যায়নের পাশাপাশি সহকর্মী শিক্ষক কর্তৃকও সকল শিক্ষকের মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ। এজন্য বিভাগের একাডেমিক কমিটি একটি নির্দিষ্ট ফর্মেট করে দিতে পারে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নীতিমালা করে মূল্যায়ন ফর্ম তৈরি করে দিতে পারে। তবে কোন ক্লাশটি মূল্যায়িত হবে এবং কমিটিতে কে সদস্য থাকবে সেটা বিভাগীয় প্রধান কোর্স শিক্ষকের সাথে আলোচনা করেই সেটা ঠিক করবেন।

১৩। জ্ঞান আহরণের মূল উৎস হলো বই। শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের টেক্সট বইয়ের পাশাপাশি রেফারেন্স বই পড়ার ব্যাপারেও উৎসাহিত করতে হবে। তবে শিক্ষার্থীরা হয়ত সকল বই কিনতে পারবে না। তাই শিক্ষক যে বই পড়াবেন তা লাইব্রেরীয়ানকে অবহিত করবেন এবং তিনি বইগুলোকে লাইব্রেরির জন্য যত দ্রুত সম্ভব কিনে সেগুলো সেখানে সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তবে এটা বাধ্যতামূলক নয় যে সকল বইয়ের হার্ড কপি কিনতে হবে। লাইব্রেরি চাইলে ই-বই কিনে রাখতে পারে যেগুলো অনলাইন রিপোজিটরিতে থাকবে এবং একজন শিক্ষার্থী যেন তা যে কোনো জায়গা থেকেই তার ই-লাইব্রেরি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা অ্যাকসেস করতে পারে। একই সঙ্গে লাইব্রেরি তে ই-জার্নালের সাবস্ক্রিপশন রাখারও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৪। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাদের প্রতিটি মূল্যায়নের ফলাফল সময়মতো জানানোর ব্যবস্থা করা। যেমন, শিক্ষক তার ক্লাশ টেষ্ট, ক্যুইজ, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেট, মিডটার্ম পরীক্ষা এগুলোর নম্বর শিক্ষার্থীদের ক্লাশে জানিয়ে দিতে পারেন অথবা বিভাগের নোটিশ বোর্ডেও টানিয়ে দিতে পারেন। শিক্ষকদের জন্য যদি বিভাগের ওয়েবসাইটে পোর্টাল থাকে সেখানেও তিনি তা আপলোড করে দিতে পারেন। এছাড়া বিভাগের পক্ষ থেকে ফেসবুক গোষ্ঠী তৈরি করেও অনেক কম সময়ে একজন ছাত্র-ছাত্রীর কাছে রেজাল্ট পৌঁছে দেয়া সম্ভব। এই ফেসবুক গোষ্ঠীতে বিভাগ চাইলে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন সহ বিভাগের জন্য দরকারী তথ্যও এখানে প্রকাশ করতে পারে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইমেইল ডোমেইন থাকে। সেখান থেকেও শিক্ষার্থীদের ইমেইল অ্যাড্রেস নিয়ে গোষ্ঠী তৈরি করে শিক্ষার্থীদের ফলাফলসহ বিভিন্ন বিষয়াদি অবহিত করা যেতে পার।

১৫। শেষ বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের থিসিস, প্রজেক্ট বা ক্যাপস্টোন ডিজাইন প্রজেক্ট করতে হয়। এজন্য তাদের তৃতীয় বর্ষেই থিসিস প্রপোজাল রেডি করতে হয়। শিক্ষার্থীরা কোন শিক্ষকের অধীনে তার কাজ করবে সেটা তাদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেয়া উচিৎ। তবে তারা যেন সেটা বুঝতে পারে এজন্য শিক্ষকদের গবেষণা প্রোফাইল বিভাগের ওয়েবসাইটে এবং ফেসবুক গোষ্ঠীতে আপলোড করে দিতে হবে।  বিভাগের গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভাগের অধীনে কিছু গবেষণা সেল থাকতে হবে যেটাতে এক বা একাধিক শিক্ষক এবং এইসব শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দল যুক্ত থাকবে। প্রতিটি রিসার্চ সেলের অধীনের বিভিন্ন দলগুলো চেষ্টা করবে তাদের কাজগুলো দিয়ে বিভিন্ন জার্নাল বা কনফারেন্স পেপার করতে। এই কাজে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিবেন গবেষণা তত্ত্বাবধানকারী শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্য গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ল্যাবরেটরি, নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থান, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, যথেষ্ট পরিমাণ জনবল এবং যাবতীয় আসবাবপত্র ও ফান্ড সরবরাহ করতে হবে। বিশেষ করে ফান্ডের কারণে যেন গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায় সেদিকে সবার বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

আমরা যদি সকল শিক্ষকরা মিলে খুব দ্রুত এই কাজগুলো সম্পাদন করতে থাকি তাহলে অতি দ্রুত একটা ভালো অবস্থানে চলে আসতে পারব। আমাদের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি তাদের প্রকৌশঅল বিষয়ক প্রোগ্রামগুলকে আউটকাম বেজড এডূকেশন ব্যবস্থার অধীনে ঢেলে সাজায় এবং সে অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারে তাহলে খুব শীঘ্রই আমরাও ওয়াশিংটন চুক্তির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করতে পারব। তখন আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আরও বেশি করে বিদেশে প্রকৌশল পেশার চাকুরি লাভ করতে পারবে। আর তাতে করে বাংলাদেশ আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে অন্যদিকে বিদেশি প্রকৌশলী আনা কমে যাওয়ার ফলে দেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করার হাত থেকেও বেঁচে যাবে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৌশল শিক্ষা আর গবেষণা কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়ে উঠার মাধ্যমে এদেশ বিশ্বসেরা প্রকৌশলী তৈরি করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে এই আশা সবার মনে সঞ্চারিত হোক আর প্রকৌশল শিক্ষা প্রদানে বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকারই হোক আমাদের বর্তমান ধ্যান-জ্ঞান। আসুন সবাই মিলে সুন্দর ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মানে আবারও অঙ্গাকারাবদ্ধ হই।

লেখক:
অধ্যাপক ড প্রকৌশলী মুহিবুল হক ভূঞা
অধ্যাপক ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান
তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ
সাউথইষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়
২৫১/এ ও ২৫২ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা ১২০৮।