আন্তর্জাতিক

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ | মাথাপিছু আয়ে শীর্ষ ১০ দেশ

ধনী দেশ মানেই কি বড় অর্থনীতি?

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ | মাথাপিছু আয়ে শীর্ষ ১০ দেশ, ঢাকা-বাংলাদেশ।
বিশ্বের কোনো দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বিচার করতে গেলেই আমাদের চোখে প্রথমে ভেসে ওঠে মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একটি দেশের অর্থনীতি বড় হলেও সেই দেশের নাগরিকরা যে সবাই সমানভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করেন, এমনটা নয়।

এই কারণেই অর্থনীতিবিদরা এখন বেশি গুরুত্ব দেন মাথাপিছু আয় (GDP per capita)-এর ওপর। এটি বোঝায়—একজন নাগরিক গড়ে কতটুকু অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন এবং তার জীবনমান কেমন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বড় অর্থনীতির পাশাপাশি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশগুলোও স্থান পেয়েছে।

মাথাপিছু আয় কোনো দেশের মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও জীবনমানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর তালিকা ২০২৫ (মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে)

১. লিচেনস্টাইন – বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ

ইউরোপের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লিচেনস্টাইন ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। মাত্র ১৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটির জনসংখ্যা খুবই কম, কিন্তু মাথাপিছু আয় আকাশছোঁয়া—২,০১,১১২ মার্কিন ডলার।

একসময়ের কৃষিনির্ভর সমাজ আজ উন্নত উৎপাদনশিল্প, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, দন্তচিকিৎসা সামগ্রী ও আর্থিক সেবার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির আর্থিক খাত অত্যন্ত স্বচ্ছ ও শক্তিশালী।

সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সুইস ফ্রাঁ ব্যবহারের সুবিধা, ইউরোপীয় মুক্তবাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ এবং AAA ক্রেডিট রেটিং লিচেনস্টাইনকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা দিয়েছে।

২. সিঙ্গাপুর – এশিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ময়

একসময়ের দরিদ্র বন্দরনগরী সিঙ্গাপুর আজ এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর একটি। দেশটির মাথাপিছু আয় ১,৫৬,৯৬৯ ডলার।

See also  হিমাচলে এক তরুণীকে দুই ভাইয়ের বিয়ে- যা জানা গেল

১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার পর সিঙ্গাপুর সরকার শিক্ষায় বিনিয়োগ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও রপ্তানিনির্ভর শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলাফল হিসেবে দেশটি এখন বিশ্বব্যাপী ব্যবসা, ফিনটেক, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সেবার কেন্দ্র।

বিশ্বব্যাংকের Human Capital Index-এ প্রথম স্থান সিঙ্গাপুরের মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় প্রমাণ।

১. লিচেনস্টাইন – ক্ষুদ্র আয়তন, বিশাল সমৃদ্ধি

লিচেনস্টাইন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশই নয়, বরং এটি উন্নত ব্যবস্থাপনা ও উচ্চমূল্যের শিল্প অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ। দেশটির জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৪০ হাজার, ফলে উৎপাদন ও আয়ের সুফল সরাসরি নাগরিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

লিচেনস্টাইনের অর্থনীতির বড় শক্তি হলো উচ্চ-প্রযুক্তির উৎপাদন শিল্প—বিশেষ করে প্রিসিশন টুলস, মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং ডেন্টাল টেকনোলজি। দেশটি গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে, যা উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করেছে।

সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার দেশটির রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। কম করহার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে।

২. সিঙ্গাপুর – পরিকল্পিত উন্নয়নের সফল মডেল

সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক সাফল্য হঠাৎ আসেনি; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নীতির ফল। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দেয়।

সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক বন্দর, ফিনান্সিয়াল হাব ও ডেটা সেন্টার কেন্দ্র। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক ও স্মার্ট সিটি প্রকল্প দেশটির অর্থনীতিকে ভবিষ্যতমুখী করেছে।

এছাড়া কঠোর আইন, স্বচ্ছ প্রশাসন ও কম দুর্নীতি সিঙ্গাপুরকে ব্যবসার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি বানিয়েছে।

৩. লুক্সেমবার্গ – ইউরোপের ব্যাংকিং শক্তি

লুক্সেমবার্গের সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবা। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ তহবিল, প্রাইভেট ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করে।

See also  ২০২৬ সালেও পাসপোর্ট সূচকে শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের অবস্থান কত?

দেশটি শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং নয়, বরং গ্রিন ফাইন্যান্স ও ফিনটেক খাতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে লুক্সেমবার্গ দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক পুঁজির নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

উচ্চ শিক্ষিত কর্মশক্তি ও বহুভাষিক সমাজ ব্যবসার পরিবেশকে আরও সহজ করেছে।

৪. আয়ারল্যান্ড – করনীতিতে কৌশলগত সাফল্য

আয়ারল্যান্ডের উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে করনীতির কৌশলগত ব্যবহার। তুলনামূলক কম করহার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করেছে।

প্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে দেশটির রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। আয়ারল্যান্ড এখন ইউরোপের অন্যতম ডিজিটাল ও মেডিকেল রিসার্চ হাব।

তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বহুজাতিক কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

৫. কাতার – জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বৈচিত্র্যের পথে

কাতারের অর্থনৈতিক শক্তির মূল উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস ও LNG রপ্তানি। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিয়েছে।

বর্তমানে কাতার সরকার অর্থনীতিকে একমুখী নির্ভরতা থেকে বের করতে শিক্ষা, খেলাধুলা, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে। বিশ্বকাপ আয়োজন দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে।

২০২৬ সালেও পাসপোর্ট সূচকে শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের অবস্থান কত?

৬. নরওয়ে – প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার

নরওয়ের সাফল্যের মূল রহস্য হলো তেল আয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা। সরকার তেল আয় সরাসরি খরচ না করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে।

এই মডেল বিশ্বের বহু দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ নরওয়ের জীবনমানকে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে রেখেছে।

See also  ভারতে সিরিয়াল বিয়ে প্রতারক সামিরা ফাতিমা গ্রেফতার, ৯টি বিয়ের পরিকল্পনার অভিযোগ

৭. সুইজারল্যান্ড – নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা

সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতার ওপর। বিশ্বজুড়ে সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিরাপদ হিসেবে পরিচিত।

ঘড়ি, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, ফার্মাসিউটিক্যাল ও প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং দেশটির রপ্তানির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা দেশটিকে উদ্ভাবনে এগিয়ে রেখেছে।

৮. ব্রুনেই – সম্পদ বনাম বৈচিত্র্যের চ্যালেঞ্জ

ব্রুনেইয়ের মাথাপিছু আয় বেশি হলেও অর্থনীতি অত্যন্ত তেল ও গ্যাসনির্ভর। সরকার এখন ধীরে ধীরে হালাল শিল্প, পর্যটন ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

কম জনসংখ্যা নাগরিকদের জন্য উচ্চ ভর্তুকি নিশ্চিত করলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য জরুরি।

ফেসবুকে আসছে অর্থ আয়ের নতুন সুযোগ-মার্ক জাকারবার্গ

৯. গায়ানা – নতুন সম্ভাবনার দেশ

গায়ানা এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। তেল আবিষ্কারের ফলে দেশটির রাজস্ব হঠাৎ বেড়েছে।

সরকার এই আয় অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করছে, যাতে “resource curse” এড়ানো যায়। সুশাসন বজায় রাখতে পারলে গায়ানা ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে।

১০. যুক্তরাষ্ট্র – উদ্ভাবনের নেতৃত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির মূল চালিকা শক্তি হলো উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি। সিলিকন ভ্যালি, ওয়াল স্ট্রিট ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় দেশটিকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে রেখেছে।

যদিও আয় বৈষম্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে ধনী দেশের তালিকায় ধরে রেখেছে।

এই দেশগুলোর সাফল্য প্রমাণ করে—প্রাকৃতিক সম্পদ, সুশাসন, মানবসম্পদ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একসঙ্গে থাকলেই প্রকৃত সমৃদ্ধি আসে।